৮ই জুলাই ২০২৪। সোমবারের এই রৌদ্রোজ্জ্বল দিনটি একটি উৎকন্ঠিত দিন। জিলহজ্ব মাসটি শেষ হয়েছে গতকাল। দেশে চলছে উত্তাল কোটা আন্দোলন।
হিজরী নববর্ষ উপলক্ষ্যে স্কুল বন্ধ। আমি শ্বশুর বাড়ি যাবো। সেখানে রয়েছে ইসরাত জাহান। আমার প্রিয় স্ত্রী। সে সন্তান সম্ভবা। সম্ভাব্য তারিখ ২৬ জুলাই। সেই হিসেবে আমার ধারনা ২০ তারিখের আগে কিছু হচ্ছে না।...
১২ তারিখ আমার কলেজ নিবন্ধন পরীক্ষা।
মহররমের বন্ধ উপলক্ষ্যে আমি এসেছি মিশুর কাছে। আম্মাই বলে পাঠালেন। আমি যখন বাড়িতে এসছি, ভরদুপুর। পাইথলের লাল ব্রীজের উপর তুলোট মেঘরাশি খেলা করছে।
স্বাভাবিকভাবেই ঘরে এলাম। রুমে ঢুকবো। সময় ১১.৪৩ এর মতো।
মমতাজ বেগম আছেন রান্নাঘরে। তিনি আমার শ্বাশুড়ি মা। তিনি ঘরে যেতে বাড়ন করলেন। মিশু কি আজ মা হবে?
না, এতো আগে কীভাবে সম্ভব?
আমি ভাবছি কোন মেহমান এসেছে। পর্দানশীন মহিলা। সেজন্য মিশুর রুমে যাওয়ায় একটু restriction.
"আমার আব্বারে ফোন দিছেন? আমার আব্বারে আমি দিতাছি মোবাইল।"
এমনভাবে সে কথা বলছে, যেন এই বাবার অধিকার সে যেকোন মূল্যে ছাড়তে নারাজ। ডাক্তার আসলেন।ডাক্তারের নাম কানুন।
তিনি যখন আসলেন দুপুর শেষ। বিকালবেলা। দুজন ধাইমা আছেন। একটু পরপর খবর জানতে যাচ্ছে শ্বাশুড়ি মা। ধাইমার দৃঢ় বিশ্বাস, তারা ব্যপারটা পারবেন। অবস্থা ভালো। কোন ব্যপারনা।
আমি আম্মাকে ফোন করলাম। নানু আছেন আমাদের বাড়িতে। নানুর নাম জমিলা খাতুন। জমিলা সুন্দরী বলে তিনি নাতি সমাজে পরিচিত। তিনি যথেষ্ট ফর্সা চামড়ার অধিকারী বলে এই উপাধি।
আম্মা নামাজ শেষ করে রওনা দেবেন। আমি তীব্র উৎকন্ঠিত। মনে শুধু একটাই প্রার্থনা মিশু সুস্থ থাকুক ও আমার সন্তান পৃথিবীতে আসুক।
বিকাল নেমেছে। হঠাৎ মাথায় বাজ পড়ার মতো অবস্থা। ১১ টায় ব্যথা এখন ৪ টার বেশি বাজে। আম্মা আর জমিলা খাতুন এসেছেন অনেক্ষন হলো। তাঁরা আমাকে এই নিয়ে দোষ দিতে চাচ্ছেন, কেন হাসপাতালে নিইনি আগে!
ধাইমাগন বললেন,
অন্য চেষ্টা করুন। আমাগোর পক্ষে অসম্ভব।
ডাক্তার কানন একই কথা বললেন।
হাসপাতালে নিলেই best হয়। এখন risk নেয়া ঠিক হবে না।
ভয় পাচ্ছি। একটু ভবিষ্যৎ যদি আমি দেখতে পেতাম! একটা তীব্র ভয়,উৎকন্ঠা আমাকে আঁকড়ে ধরেছে। আমার সন্তান কি এই এই পৃথিবীতে আসবে না? এই গ্রহ সে দেখবে না? আমার মন খাঁটি নিয়তে প্রার্থনারত।
চারপাশে negativity. যেই ফোন করছে বলছে অনেক দেরী হয়ে গেলো। একটা সিঙ্গেল মানুষও বলে না,
আল্লাহ ভরসা, সব কিছু ভাল হবে।
একটা প্রাইভেটকার আনা হলো। মিশুকে গাড়িতে উঠানোর সময় আম্মা,শাশুড়ী ও মিশু উঠলো পেছনের সিটে।
তিনজনের সিটে নানুও ক্যাচাকেচি করে উঠতে চাচ্ছে। রাগে ক্ষোভে আমার শরীর রিরি করছে।
একটা প্রসূতির অবশ্যই একটা কমফোর্ট zone লাগে। সেখানে already সবগুলো সিট পূর্ণ। তবুও ওনার উঠতেই হবে। আমার যদিও মিশুর সাথে যাবার একান্ত ইচ্ছা ছিলো। আমি sacrifice করলাম। নানুকে আমি নিয়ে আসছি অটো দিয়ে। বললাম আমি।
প্রচণ্ড মানসিক চাপ। নানু একটু পরপর বলছেন, আমার ব্যাগ, আমার ব্যাগ নিছে ঝর্ণা? একটা ফোন দাও!
আমি যাচ্ছি পারুলদিয়া দিয়ে। প্রাইভেটকার যাচ্ছে জৈনা দিয়ে। আমার দম বন্ধ হয়ে আসার উপক্রম।
প্রাইভেটকারে ফোন দিলাম। মিশু স্বাভাবিক আছে।
সারমিন আন্টির ফোন।
বাবা, যাচ্ছো তো সময় হারিয়ে,.... উচিত হয় নাই,..
ভীষন খারাপ লাগছে। বেবী আন্টিও একই ধরনের কথা বললেন।
ভালুকার সেবা হাসপাতালে বেবী আন্টি সিরিয়াল দিয়ে রাখলেন। মানিক মামাও আছেন সেখানে। কোটা আন্দোলনে সারাদেশ এখন উত্তাল। মেস ছেড়ে বাড়ি ফিরেছে বিন্ত।
আমি এখন পথে। পনাশাইল বাজার পার হবার ১ মিনিট আগে। সিএনজির ব্রেক ছিড়ে গেলো। আমি আরো ভয় পাচ্ছি।
আমার মন থেকে আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলাম,
হে রব, হে সকল প্রাণের সৃষ্টিকর্তা ও প্রতিপালক। তোমার আত্মার ভাণ্ডারে কত রূহই তো তুমি প্রতিনিয়ত এই পৃথিবীতে পাঠাও। এই আত্মা তো তোমার কাছেই আবার ফিরে যাবে। তুমিই তো তাকে নিয়ে নেবে আমার প্রভু। আমার ঘরে এক সুস্থ্য-সবল মানবশিশুকে তুমি দান করো।
এই দোয়া কেউ আমাকে শেখায়নি। আমার অন্তরের অন্তস্তল থেকে এই প্রার্থনা আসলো। আল্লাহ এই অধমের দোয়া কবুল করলেন।
সুস্থ্য সবল ও সম্ভবত যথেষ্ট সাহসী একজন মানব শিশু সৃষ্টিকর্তার উপহাররূপে (অবশ্যই আমানত) আমাদের ঘরে এলো।
প্লাস দিয়ে টেনে টেনে রাস্তায় সিএনজিটি চালাচ্ছে ড্রাইভার। ড্রাইভারের নামটা মনে পড়ছে না।
আমাদের আগেই তারা হাসপাতালে আছেন। জনাব নজরুল ইসলাম, আমার শ্বশুর। তিনি প্রাইভেটকারে এসেছিলেন। তিনিও সারাদিন প্রচণ্ড উৎকণ্ঠিত ছিলেন।
এখন আমরা হাসপাতাল আছি। উৎকন্ঠা একটুও কমেনি। হাসপাতালের পরিচালক বিভিন্ন ভয় ভীতি দেখাচ্ছেন।
শিশুর হার্টবিট কমে গেছে। শিশুটিকে বাঁচানোর একমাত্র অপশন হলো তাৎক্ষণিক সিজার।
আম্মা আমাকে বিভিন্ন রকম দোষারোপ করছেন। আমি এম্নিতেই ভেঙে আছি। তার উপর এসব কথা আমার ভাল্লাগছে না।
আমার নাতি ও তার মার যেন কিছু না হয়।
আমি বললাম, ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবো। যা হয়ে গেছে তা নিয়ে তোমাকে কেউ ভাবতে বলে নাই। আম্মা এই কথায় কষ্ট পেলেন। আমার নামে আব্বার কাছে নালিশ করলেন।
বিন্ত,অমি ও মানিক মামা সারাক্ষন হাসপাতালে। বেবী আন্টি আমাদের প্রয়োজনীয় খাবার ব্যবস্থা করলেন।
আমরা সিজার পরবর্তী জিনিসপত্র কেনার জন্য ফার্মেসীতে যাব। একটু হালকা ভাজাপুড়ি খেলাম আমি আর বিন্ত। সারাদিন ধকল যাচ্ছে। রক্ত পাওয়া যাচ্ছে না।
বিন্ত আর ছোটভাই তাসিন ও বন্ধু রানার কল্যানে ২ জন Donors পাওয়া গেলো।
আর ঘন্টা পর। দেখলাম সিজার পরবর্তী সব যোগারযন্ত্র করে এনেছেন আমার শ্বশুর।
হাসপাতাল চার তলা। মিশু আছে তিনতলায়। তার পাশের রুমটিই অপারেশন থিয়েটার।
আমি তিনতলায় ফিরতেই অমি দৌড়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরলো।
বাবু হয়ে গেছে, দুধে ময়লা আছে, বাবুর শরীরে ময়লা নাই। এসব বলে সে উতলা হয়ে আছে।
তার খুশিতে আমার খুশি দ্বিগুন হলো। আমার শ্বশুর প্রায় সাত দিন একথাই বলে গেলেন, মানিক ভাইয়ের মেয়ের খুশি দেখেই আমি আত্মহারা। এত নির্মল খুশি আমাদেরকে উদ্বেলিত করে রেখেছে।


1 মন্তব্যসমূহ
এই মন্তব্যটি একটি ব্লগ প্রশাসক দ্বারা মুছে ফেলা হয়েছে।
উত্তরমুছুন